ইভেন্ট

৭ই মার্চের ভাষণের তাৎপর্য ব্যাখ্যা

৭ই মার্চের ভাষণের তাৎপর্য ব্যাখ্যা। যারা ৭ই মার্চ এর ভাষণের তাৎপর্য বা গুরুত্ব সম্পর্কে জানতে চাচ্ছেন আজকের পোস্ট শুধুমাত্র তাদের জন্য। আজকের পোস্টে আমরা ৭ই মার্চের ভাষণ এর তাতপর্য তথা গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা করবো। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে রচিত হয়েছিল এক অনবদ্য মহাকাব্য। আর এ মহাকাব্যের রচয়িতা বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আজকে আমরা বাঙালির মুক্তির সনদ নামে পরিচিত ঐতিহাসিক সেই ৭ই মার্চের ভাষণ সম্পর্কে জানবো।

৭ই মার্চের ভাষণের পটভূমি

আবেগে, বক্তব্যে, দিকনির্দেশনায় এই ভাষণটি ছিল অনবদ্য। যা স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় বাঙালি জাতির জন্য দিকনির্দেশনা হিসেবে প্রধান ভূমিকা রেখেছে। মূলত বাঙালি জাতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দিকে চেয়েছিল। পরােক্ষভাবে সেদিন তারা নিজেদেরকে স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করে ফেলেছিল। আর ভেতরে ভেতরে চলছিল মুক্তিযুদ্ধের সার্বিক প্রস্তুতি। তেজোদীপ্ত বাঙালি তখন জয় বাংলা মন্ত্রে উজ্জীবিত ছিল।
পড়ুনঃ ৭ই মার্চের ভাষণ

৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ ও বাঙালির স্বাধীনতার প্রস্তুতি

বাঙালি জাতি তাদের মহান নেতা, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণের প্রতিটি কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে এটিকে এ জাতির ক্রান্তিকালের এক অমিয় নির্দেশ হিসেবে। বাঙালি জাতি যতদিন থাকবে, ততদিন এ জাতির অন্তরে বেঁচে থাকবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে ধ্বনিত হবে বঙ্গবন্ধুর দরাজ কন্ঠে উচ্চারিত মহান ৭ মার্চের সেই ঐতিহাসিক ভাষণের প্রতিটি লাইন, প্রতিটি বাক্য, প্রতিটি শব্দ।
দেখুনঃ ৭ই মার্চের ভাষণের বৈশিষ্ট্য

৭ই মার্চের বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের তাৎপর্য

১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের ফলে সামরিক শাসক আইয়ুব খানের পতন হয়। এরপর ক্ষমতায় আসে আরেক পশ্চিমা শাসক ইয়াহিয়া খান লালনর আন্দোলনের কারণে জাতীয় পরিষদের নির্বাচন দিতে বাধহনআত্রেনির্বাচনে জয়লাভ করে অনুসারে শাসনক্ষমতাসাওয়ার কাধ জয়াম লীগেরই। কিন্তু পাকিস্তানি শাসক গােষ্ঠী কখনােই বাঙালির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে রাজি ছিল না। তারা চাইত সব সময়।বাঙালিরা তাদের হাতের পুতুল হয়ে থাকুক। তাই তারা গণতন্ত্র হত্যার হীন খেলায় মেতে ওঠে। তারা কোনাে কারণ ছাড়াইগণপরিষদের অধিবেশন বন্ধ করে দেয়।

এ ছাড়া বাঙালি জাতির ওপর শুরু করে দমন-পীড়ন ও নির্যাতন। এর প্রতিবাদে সারা বাংলায়।প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। বাঙালি জাতি গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলনে সােৎসাহে যােগ দেয়। আর এরই পরিপ্রেক্ষিতে বাঙালির প্রাণপ্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সােহরাওয়ার্দী উদ্যান) প্রায় দশ লাখ মানুষেরউপস্থিতিতে ১৮ মিনিটব্যাপী এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। এই ভাষণটি ছিল খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। যা পরবর্তী কালে বাঙালির মুক্তি আন্দোলনের প্রধান দিকনির্দেশনা হিসেবে ভূমিকা রাখে।
আরো দেখুনঃ ৭ই মার্চের সম্পূর্ণ ভাষণ

ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণের তাৎপর্য বিশ্লেষণ

১. সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালােচনা : ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চের ভাষণের শুরুতেই বাবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের সামগ্রিক পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি তুলে ধরেন পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর বর্বর অত্যাচারের কথা। গণতন্ত্রের বিজয় হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তানি শাসকরা তা মেনে না নিয়ে বাঙালি নিধনে মেতে ওঠে; যা বাংলার মানুষ মেনে নেয়নি কখনাে। তাই তিনি বলেছিলেন, আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলার মানুষ তার অধিকার চায়।

২. বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা ও অবস্থান ব্যাখ্যা : একজন শান্তিকামী নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু বারবার আলােচনার মাধ্যমে সংকট মােকাবিলা করতে চেয়েছিলেন। আর তার সুস্পষ্ট ইঙ্গিতও ছিল ভাষণের মধ্যে। কিন্তু পাকিস্তানি শাসক গােষ্ঠী তা উপেক্ষা করে ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে বসে থাকতে মরিয়া হয়ে ওঠে। ভাষণে বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন চালিয়ে যাওয়ার অনুরােধ করেছিলেন। কিন্তু তার যৌক্তিক কোনাে দাবিই শাসকগােষ্ঠী মেনে নেয়নি। উল্টো তারা দমন-পীড়নের মাধ্যমে বাঙালি নিধনে মেতে ওঠে।

৩. পাকিস্তানি রাজনীতিকদের ভূমিকা : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলার মানুষের মুক্তির জন্য বারবার জাতীয় পরিষদের অধিবেশনের মাধ্যমে পাকিস্তানের অন্যান্য রাজনৈতিক নেতা-কর্মীর সঙ্গে আলােচনা করতে চেয়েছেন। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানি শাসক গােষ্ঠী কখনােই তা সমর্থন করেনি। কারণ এতে তারা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার ভয় পেত। তাই ইয়াহিয়া খান, জুলফিকার আলী ভুট্টোসহ অন্যরা নানা উপায়ে আলােচনা এড়াতে চেয়েছিল। তারা বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এবং
তার নামে নানা অপপ্রচার চালাতে থাকে।

৪. সামরিক আইন প্রত্যাহারের আহ্বান : ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি শাসক গােষ্ঠী সামরিক আইন জারি করে বাংলার মানুষকে জিম্মি করে রেখেছিল। তারা ভেবেছিল, অস্ত্র দ্বারা দমন করবে বাঙালিকে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু পশ্চিম পাকিস্তানি শাসক গােষ্ঠীর এ হীন চেষ্টা বুঝতে পেরে এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। তিনি এ ভাষণের মাধ্যমে সামরিক আইন প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছিলেন।

৫. অত্যাচার ও সামরিক আগ্রাসন মােকাবিলার আহ্বান : ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী বেপরােয়া হয়ে উঠেছিল, বাঙালি নিধনে মেতে উঠেছিল। তারা ভেবেছিল, বাঙালি ভীরু জাতি। তাই এদের অস্ত্র দ্বারা দমন করবে। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানিদের এ হীন নীতি বুঝতে পেরে এর বিরুদ্ধে প্রতিরােধ গড়ে তােলার আহ্বান করেছিলেন। ৭ই মার্চের ভাষণে তিনি ঘােষণা করেছিলেন, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তােলাে। তােমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মােকাবিলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সবকিছু- আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি, তােমরা বন্ধ করে দেবে।

৬.দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বুঝতে পেরেছিলেন, পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের কোনাে বিকল্প নেই। কেননা আন্দোলন ব্যতীত কখনাে বাংলার মানুষ মুক্তি লাভ করতে পারবে না। তাই তিনি এই ভাষণে সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন অনির্দিষ্ট কালের জন্য শান্তিপূর্ণ হরতাল পালনের। এ ছাড়া সব ধরনের কর না দেওয়ারও আহ্বান করেছিলেন। সরকারি অফিস-আদালত বন্ধ করে সবাইকে দাবি আদায়ে আন্দোলন করার নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি।
আরো পড়ুনঃ ৭ই মার্চের ভাষণ ইউনেস্কোর স্বীকৃতি দেয় কবে

৭. অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও সম্প্রীতির আহ্বান : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে বুঝতে পেরেছিলেন, পাকিস্তানি শাসকগােষ্ঠী ধর্ম দিয়ে এ দেশের মানুষকে পৃথক করার চেষ্টা করবে। তাই তিনি এই ভাষণের মাধ্যমে বাঙালি জাতিকে ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রেখে ঐক্যবদ্ধ চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে স্বাধীনতাসংগ্রামে অগ্রসর হওয়ার আহ্বান করেছিলেন।

৮. নিগ্রহ আক্রমণ প্রতিরােধের আহ্বান : পাকিস্তানি শাসক গােষ্ঠী এ দেশের মানুষকে চিরদিনের জন্য দাসত্বের নিগড়ে বন্দী করে রাখতে চেয়েছিলাে। তাই তারা অত্যাচারের নানা পথ বেছে নিয়েছিল। তারা ভেবেছিল, অস্ত্রের মুখে এ দেশের মানুষকে চিরদাসে পরিণত করবে; যা বঙ্গবন্ধু উপলদ্ধি করেছিলেন এবং এই ভাষণের মাধ্যমে এর বিরুদ্ধে প্রতিরােধ গড়ে তুলতে সাধারণ মানুষকে আহ্বান করেছিলেন।

৯. স্বাধীনতার ডাক : বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ এই ভাষণের শেষ পর্যায়ে তিনি স্বাধীনতার ডাক দেন। তিনি ভাষণের সর্বশেষে বলেন-
“এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম
এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”।

১০. ভ্রাতৃত্ববােধের মর্মবাণী : বাঙালি জাতির মধ্যে সুদৃঢ় ভ্রাতৃত্ববােধ, ঐক্য ও অস্তিত্বের প্রশ্ন সর্বদাই জাগ্রত করে এমন কথাগুলােই তিনি তার ভাষণে তুলে ধরেছেন। তিনি বাঙালি জাতির সদস্যদেরকে ‘ভায়েরা আমার’ বলে সম্বােধন করে এ বােধকে জাগ্রত করেছেন। তাঁর ভাষণটি শুরু হয়েছিল এভাবে, “ভায়েরা আমার, আজ দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি। আপনারা সবই জানেন ও বােঝেন, আমরা জীবন দিয়ে চেষ্টা করেছি।”

১১. বাঁচার দাবি : পাকিস্তান সরকার এদেশের মানুষকে দীর্ঘ ২৩ বছর শাসন করেছে। তারা ভূমিকা পালন করেছে শাসকের এবং শাসিত হিসেবে শােষণ আর বঞ্চনার শিকার হতে হয়েছে এদেশের মানুষকে, বাঙালিদেরকে। এদেশের মানুষ বার বার তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। পাকিস্তানি শাসকগােষ্ঠি বাঙালি জাতিকে চারদিক থেকে নানা চক্রান্তের ফাঁদ পেতে মারার যে কৌশল গ্রহণ করেছিল, তা থেকে দেশবাসী মুক্তি চেয়েছে, বাচতে চেয়েছে। বঙ্গবন্ধু তার ৭ মার্চের ভাষণে এ মুক্তি আর বাঁচার কথা ঘােষণা করেন এভাবে, “আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলার মানুষ তার অধিকার চায়।”

১২. অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি : ১৯৭০-এর নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিল। দেশবাসীর স্বপ্ন ছিল, এ দলটি ক্ষমতায় বসে দেশবাসীর অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি ঘটাবে। কিন্তু এ মুক্তি অর্জিত হয়নি। বঙ্গবন্ধুকে ক্ষমতা অর্পণ করা হয়নি। উল্টো চালানাে হয়েছে নানা অত্যাচার ও নির্যাতন। ভাষণে উল্লেখ করা হয়েছে, “কী অন্যায় করেছিলাম? নির্বাচনের পরে বাংলাদেশের মানুষ সম্পূর্ণভাবে আমাকে আওয়ামী লীগকে ভােট দেন। আমাদের ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলী বসবে। আমরা সেখানে শাসনতন্ত্র তৈরি করব এবং এদেশকে আমরা গড়ে তুলব। এদেশের মানুষ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি পাবে। কিন্তু, দুঃখের বিষয়, আজ দুঃখের সাথে বলতে হয়, ২৩ বছরের ইতিহাস বাংলার অত্যাচারের, বাংলার মানুষের রক্ত দানের ইতিহাস। ২৩ বছরের ইতিহাস মুমূর্ষ নর-নারীর আর্তনাদের ইতিহাস, বাংলার ইতিহাস এদেশের মানুষে রক্ত দিয়ে রাজপথ রঞ্জিত করার ইতিহাস

১৩. সুপ্ত ক্ষোভের প্রকাশ : পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে সব সময় সব ক্ষেত্রেই চলেছে শােষণ-বঞ্চনা। পূর্ব পাকিস্তানের উপার্জিত অর্থে উন্নয়ন হয়েছে পশ্চিম পাকিস্তানে। শুধু তা-ই-নয়, এদেশের ঘামে ভেজা অর্থে কেনা অস্ত্র তাক করা হয়েছে সব সময় বাঙালির বুকের দিকে। শুধু তাক করেই শেষ নয়, সে অস্ত্র থেকে গুলি চালিয়ে নিরস্ত্র বাঙালির বুক থেকে রক্ত ঝড়িয়েছে পাকিস্তানি শাসকরা। বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণে এ ক্ষোভের প্রকাশ করেছেন এভাবে- “কী পেলাম আমরা? আমরা পয়সা দিয়ে অস্ত্র কিনেছি বহিঃশত্রুর হাত থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্য, আজ সেই অস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে আমার দেশের গরিব দুঃখী নিরস্ত্র মানুষের বিরুদ্ধে-তার বুকের উপর হচ্ছে গুলি।”
আরো আছেঃ ৭ই মার্চের ভাষণের মূল বিষয়বস্তু

১৪. দেশের প্রাধান্য : বঙ্গবন্ধু তার ৭ মার্চের ভাষণে ব্যক্তি বা দলের চেয়ে উর্ধ্বে তুলে ধরেছেন দেশের প্রাধান্যকে। তিনি ক্ষমতা চাননি। চেয়েছেন এদেশের মানুষের মুক্তি এবং প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন এদেশের মানুষের অধিকার। বঙ্গবন্ধুর ভাষায়- “আমি প্রধানমন্ত্রীত্ব চাই না, আমি এদেশের মানুষের অধিকার চাই।”

১৫. হরতাল ও ধর্মঘটের ডাক : বঙ্গবন্ধু তার ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে হরতাল ও ধর্মঘটের ডাক দেন। দেশবাসীকে পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত শাসনব্যবস্থাকে অচল করে দেওয়ার জন্য আহবান জানান। এ ধর্মঘট ও প্রতিবাদকে আস্তে আস্তে সংগ্রামে পরিণত করে মুক্তিযুদ্ধের দিকে অগ্রসর হওয়ার আহবান করেছেন। বঙ্গবন্ধুর ভাষায়- “আমি পরিষ্কার অক্ষরে বলে দেবার চাই, আজ থেকেই এই বাংলাদেশের কোর্টকাচারি, আদালত, ফৌজদারি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে।”

১৬. মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতির নির্দেশ : বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য ঝাপিয়ে পড়েছিলেন প্রত্যেক বাঙালি। নিরস্ত্র বাঙালির প্রস্তুতির বিপরীতে ছিল সুসজ্জিত পাকিস্তানি বাহিনী। মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রতিটি ঘরে দুর্গ গড়ে তােলার আহ্বান জানিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু এবং শেষ পর্যন্ত পুরাে দেশই পরিণত হয়েছিল একটি দুর্গে। বঙ্গবন্ধুর এসংক্রান্ত ঘােষণা ছিল – “আর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার লােককে হত্যা করা হয়, তােমাদের কাছে অনুরােধ রইল, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তােলাে।”

১৭. সেনাবাহিনীর প্রতি নির্দেশ : পাকিস্তানে সে সময় অনেকগুলাে ক্যান্টনমেন্ট ছিল এবং সেখানে অবস্থান করছিল অনেক সশস্ত্র সেনা। বঙ্গবন্ধু তাদেরকে নিরীহ বাঙালিদের উপর আক্রমণ না করার আহবান জানান। সাথে সাথে এও জানান যে যদি হামলা চালানাে হয়, তবে এর সমুচিত জবাবও দেয়া হবে। বঙ্গবন্ধুর ভাষায়, “তােমরা আমার ভাই, তােমারা ব্যারাকে থাকো, কেউ তােমাদের কিছু বলবে না। কিন্তু আর আমার বুকের উপর গুলি চালাবার চেষ্টা করাে না। সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না। আমরা যখন মরতে শিখেছি, কেউ আমাদের দাবাতে পারবে না।”

১৮. দেশরক্ষার আহ্বান : বাংলাদেশ আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি। মাতৃভূমিকে রক্ষার এ সংগ্রামে অনেক বাধাবিপত্তি আসতে পারে। বঙ্গবন্ধু এ অরাজকতায় ভ্রাতৃত্ববােধের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, আহ্বান জানিয়েছেন দেশরক্ষার। এভাবে, “মনে রাখবেন, শত্রুবাহিনী ঢুকেছে, নিজেদের মধ্যে অন্তর্কলহ সৃষ্টি করবে, লুটতরাজ করবে। এই বাংলার হিন্দু, মুসলমান, বাঙালি-ননবাঙালি যারা আছে, তারা আমাদের ভাই। তাদের রক্ষা করার দায়িত্ব আপনাদের উপর। আমাদের যেন বদনাম না হয়।

১৯. যুদ্ধের পরােক্ষ ঘােষণা : বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে মুক্তিযুদ্ধের পরােক্ষ ঘােষণা ছিল। এখানে দেশকে মুক্ত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে; রক্ত দিয়ে, জীবন দিয়ে দেশকে মুক্ত করার ঘােষণা দেয়া হয়েছে। পরিশেষে এ সংগ্রামকে পরিষ্কার করে বলা হয়েছে স্বাধীনতার সংগ্রাম। বঙ্গবন্ধুর ভাষায়, “তােমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো। রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরাে দেব। এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব, ইনশাআল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।”
এছাড়া পড়ুনঃ ৭ই মার্চের ভাষণ ইতিহাস এবং বিশ্লেষণ

শেষ কথা :
১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে রচিত হয়েছিল এক অনবদ্য মহাকাব্য। আর এ মহাকাব্যেররচয়িতা বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর হাত ধরেই এসেছে আমাদের প্রিয় স্বাধীনতা। তাঁর এইভাষণটি ১৯৭১ সালে দিশেহারা বাঙালি জাতিকে দেখিয়েছিল মুক্তির পথ। তারা স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে ছিনিয়ে এনেছিল স্বাধীনতার রক্তিম সূর্য। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের সে ভাষণের ভাব-গাম্ভীর্য ও প্রতিচ্ছবির সুস্পষ্ট প্রকাশ ঘটেছে কবি

পড়তে চোখ রাখুনঃ
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে ভাষণ
মহান শহীদ দিবস কবে? ভাষা শহীদ দিবস পালনের ইতিহাস
২১ শে ফেব্রুয়ারি জাতীয় পতাকা উত্তোলনের নিয়ম
শিক্ষামূলক ফেসবুক স্ট্যাটাস

Show More

sumon

আমার নাম সুমন। আমি একজন ক্ষুদ্র কনটেন্ট রাইটার। আমার ব্লগিং করতে অনেক ভালো লাগে। আমি সবসময় চেষ্টা করি নতুন বিষয় সমূহ নিয়ে লিখতে। এবং সেখানে বিভিন্ন ধরনের তথ্য দিয়ে সবাইকে সাহায্য করে থাকি। আশা করি আমার লেখাগুলো আপনাদের অনেক ভালো লাগে।
Back to top button